দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানি নিয়ন্ত্রণের নতুন সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা আবারো তীব্র হয়েছে। গত কয়েক মাসের বাণিজ্যবিরতির পর উভয় দেশই ফের কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীনের ওপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং দুষ্প্রাপ্য খনিজ ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির রফতানিতে সীমাবদ্ধতা এনেছে। এতে ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার সূচকগুলোয় বড় পতন ঘটেছে, প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্স ও এপি।
ট্রাম্পের নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণার মধ্য দিয়ে ছয় মাস আগে গড়ে ওঠা বাণিজ্যবিরতির পরিশেষ ঘটেছে। শুক্রবার এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ‘বেইজিং হঠাৎ করে বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট করছে।’
তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাস আমাদের সম্পর্ক ভালো ছিল। তাই চীনের এ পদক্ষেপ একেবারেই অপ্রত্যাশিত।’
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোই নতুন উত্তেজনার জন্য দায়ী। যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার পর থেকে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনা কোম্পানিগুলোকে মার্কিন বাণিজ্যের কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং চীনসংযুক্ত জাহাজে নতুন বন্দর ফি আরোপ করা। যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপ চীনের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করেছে। আমরা এসব কর্মকাণ্ডের কঠোর বিরোধিতা করছি।’
তবে বেইজিং এখনো পাল্টা শুল্ক আরোপ করেনি, যা অনেক বিশ্লেষক আলোচনার সুযোগ খোলা রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রিনপয়েন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলফ্রেডো মন্টুফার-হেলু বলেন, ‘চীন স্পষ্ট করেছে কেন তারা দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানিতে সীমাবদ্ধতা এনেছে। একই সঙ্গে তারা আলোচনার পথও খোলা রেখেছে। এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।’
অন্যদিকে বেইজিংভিত্তিক গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান হুটং রিসার্চ জানিয়েছে, যদি চীন ট্রাম্পের নতুন শুল্ক বৃদ্ধির জবাব না দেয়, তবে তা ইঙ্গিত দেবে যে বেইজিং আর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর আস্থা রাখছে না।
দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণায় চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ পদক্ষেপ কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। তাদের ভাষায়, ‘এ পদক্ষেপ কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। চীনের রফতানি নিয়ন্ত্রণ মানে রফতানি বন্ধ নয়। বেসামরিক প্রয়োজনে যেকোনো বৈধ আবেদন অনুমোদন করা হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।’
উল্লেখ্য, বর্তমানে চীন বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত দুষ্প্রাপ্য খনিজের ৯০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে। এ ১৭টি খনিজ বিদ্যুচ্চালিত যান, বিমান ইঞ্জিন, রাডার ও সামরিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে অপরিহার্য।
চীনের এ সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিবাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক এপ্রিলের পর একদিনে রেকর্ড পতন হয়। বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে ব্যাপক দরপতন ঘটে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুষ্প্রাপ্য খনিজে চীনের রফতানি সীমাবদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি চীনের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সম্প্রতি মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া ও কোয়ালকমের বিরুদ্ধে অ্যান্টিট্রাস্ট তদন্ত শুরু করেছে। চীন দাবি করেছে, কোয়ালকম গত জুনে ইসরায়েলি চিপ ডিজাইনার অটোটকস অধিগ্রহণের তথ্য তাদের জানায়নি, যা আইন লঙ্ঘন বলে তারা উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন কলেজের অর্থনীতিবিদ ও সহযোগী ডিন আলেকজান্ডার টোমিচ বলেন, ‘এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে দুই দেশই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল সরবরাহশৃঙ্খল ভাঙতে চাইছে। মূল প্রশ্ন হলো, কে আগে বিকল্প জোগান গড়ে তুলতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি সয়াবিনের উৎপাদন চক্র ঠিক জানি না। তবে বাজি ধরে বলতে পারি যে সয়াবিন উৎপাদন নতুন খেলনা কারখানা গড়ে তোলার চেয়ে অনেক দ্রুত হবে।’
বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব মার্কিন কৃষিক্ষেত্রেও স্পষ্ট। চীনা বাজার হারানোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রফতানি কমেছে। তার পরিবর্তে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এখন বড় রফতানিকারক হিসেবে উঠে আসছে। এদিকে আমদানি নির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে মার্কিন ভোক্তাদেরও নতুন চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘আগামী মাসে এশিয়া–প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপিইসি) সম্মেলনের সময় তার সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক “সম্ভব” হলেও এখনো নিশ্চিত নয়। আমি সেখানে থাকবই। তাই বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে ধরে নিচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যানকবার্ন ক্যাপিটাল মার্কেটসের প্রধান বাজার বিশ্লেষক মার্ক চ্যান্ডলার বলেন, ‘এ উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। এটি আসলে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বেরই ধারাবাহিকতা। উভয় পক্ষই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চাচ্ছে।’